নবী করিমের (সা.) বে’সতের উদ্দেশ্য

সুনিশ্চিত ভাবে বলা যেতে পারে যে, নবী করিম (সা.) প্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলামের ইতিহাসে বে’সতের দর্শনের বর্ণনা করেন। এই গবেষণা হচ্ছে আল্লাহর নবীদের হেদায়াত ও বে’সতের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। এ রচনার লক্ষ্য ও আলোচনার বিষয় হচ্ছে এই যে, জীবন ধারণের জন্য মানুষের একটি পরিকল্পনা ও কর্মসূচীর প্রয়োজন, আর মানুষ জীবন ধারণের এই কর্মসূচীকে স্বয়ং নিজে প্রস্তুত করতে পারে না
এবং সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই মানুষের ভুলের কারণে সুখ ও সৌভাগ্যের পথ থেকে তারা যে দুরে চলে গিয়েছে, আর পরিপূর্ণতায় উপনীত হওয়ার যে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য যা অর্জন হচ্ছে না, তার জন্য একজন পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন, তা প্রমাণ করা।
যেভাবে প্রত্যেক সৃষ্টিকারী অন্যান্যদের তুলনায় তার সৃষ্টিকৃত জিনিষের উপর পূর্ণ জ্ঞান রাখে, মানুষের সৃষ্টিকর্তাও মানব জাতির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অন্যদের চাইতে বেশী জ্ঞানী। আর যেহেতু মানব জাতির সৃষ্টিকর্তার খোদাঈ পদমর্যাদা উচ্চ স্তরের, যেখানে তার সাথে সরাসরি সম্পর্ক কল্পনাও করা যায় না, তাই সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝখানে কিছু মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি থাকতে বাধ্য যারা তার বাণীগুলো পৌঁছিয়ে দেবে। এই মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি মানুষ যাতে তার সুখ ও সৌভাগ্য ও মূল উদ্দেশ্য পর্যন্ত দ্রুত পৌঁছাতে পারে তার দুরত্ব কম করে।
এই মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তিরাই হচ্ছেন আল্লাহর প্রেরিত দূত বা বার্তা বাহক, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বাণী প্রাপ্ত হয় তাকে বলা হয় ওহী।
ইতিহাস ভূমিকা:
এ কথা সত্য যে ইসলামের ইতিহাসে যে ব্যক্তি প্রথম বে’সতের দর্শনের বর্ণনা করেন তিনি হচ্ছেন নবী করিম (সা.)। যিনি বারংবার তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যতে উল্লেখ করেছেন:
“বস্তুত আমাকে উন্নত নৈতিক গুণাবলী ও তার ভালোত্বর জন্য প্রেরণ করা হয়েছে” অবশ্য এটি হচ্ছে নবী করিমের (সা.) বে’সতের একটি ক্ষুদ্রতম অংশ। আর এ বিষয়ে বর্ণনা কারী হযরত আলী (আ.) হচ্ছেন দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি নাহজুল বালাগার বিভিন্ন জায়গায় নবী করিম (সা.) ও তার বে’সত নিয়ে আলোচনা করেছেন।
গবেষণার পদ্ধতি:
এ গবেষণার লেখক এই রচনাতে নিজের কোন দৃষ্টিভঙ্গি উত্থাপন করেননি আর কোন মতামতও দেননি বরং অন্যান্য মহান ওলামাদের মতামত, কোরান ও অন্য সুত্রসমূহের সাহায্য নিয়ে নবী করিমের (সা.) বে’সতের প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ করেছেন।
কোরানের দৃষ্টিতে বে’সতের কারণসমূহ:
এ অংশে আমরা কোরানের দৃষ্টিতে হেদায়াত ও নূরের আহবানকারীদের (নবীদের) বে’সতের কারণসমূহ ও ওহীর মূল উৎস নিয়ে আলোচনা করবো। যে আয়াতগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করবো প্রথমে তাকে সাতটি ভাগে ভাগ করবো যার প্রত্যেকটি অংশে আবার কয়েকটি আয়াত রয়েছে। অতঃপর প্রত্যেকটি আয়াতের ব্যাখ্যা করবো।
আলোচ্য আয়াতগুলোর সূচীপত্র:
১। তৌহীদের স্থায়িত্ব ও সম্পূর্ণকরণ।
২। সমস্ত মতবিরোধ দূর করা।
৩। শত্রুতার ভাগ।
৪। সমাজে ন্যায় বিচারের বাস্তবায়ন।
৫। স্বভাব – প্রকৃতির ভারসাম্যপূর্ণ ও শোধন।
৬। কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেওয়া।
৭। বান্দাদের উপর হুজ্জত তামাম করা।
একত্ববাদ ও তৌহীদের স্থায়িত্ব:
মানব জাতিকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হচ্ছে সূচনা ও প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে অবহতি হওয়া। আর যাদের মধ্যে মারেফত ও জ্ঞানের অভাব তারা হচ্ছে অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ লোক। কেননা প্রাণী পর্যায়ে এসে থেমে গেছে। অন্যান্য সৃষ্টিকুল যেমন: উদ্ভিদ বা প্রাণী সহজাত প্রবণতার কারণে তাদের পরিপূর্ণতায় পৌঁছায় কিন্তু মানব জাতি যদিও স্বভাবজাত ও বিচারবুদ্ধি নামের দুই শক্তিতে সুসজ্জিত তার পরও এই দুই মাধ্যমের সাহায্যে নিজের প্রয়োজনীয় পরিপূর্ণতায় পৌঁছাতে পারে না। মানুষের ইতিহাস তার চাক্ষুস প্রমাণ যে, সব সময় তৌহীদ ও হক্ব মারেফতের বিচ্যুতির গর্তে হাত পা নাড়ছে আর এখনো কোটি কোটি মানুষ প্রাণী ও জড় পদার্থের পূজা করে যাচ্ছে। এমনকি ভারতেই কোটি কোটি লোককে খোদার পরিবর্তে গাভীকে পূজা করে।
অতএব, প্রত্যেক যুগে মানুষ যখন এলাহী দাওয়াত গ্রহণ করার যোগ্যতা রাখে তখন আল্লাহর পক্ষ হতে কিছু প্রেরিত পুরুষের প্রয়োজন যাতে করে তাদেরকে মানুষের পরিপূর্ণতার মূল উদ্দেশ্য থেকে অবগত করাতে পারেন। তা না হলে সৃষ্টির উদ্দেশ্য সফলকাম হয়নি আর মানুষ তার কাঙ্খিত আশাতে পৌঁছাতে ব্যার্থ হয়েছে। কোরানের কিছু আয়াত পরিস্কারভাবে এরূপ অভিসন্ধির উপর নির্দেশনা দেয়। যার কয়েকটি আয়াত আমরা এখানে উল্লেখ করবো:
১। «و لقد بعثنا في كل امه رسولاً ان اعبد والله و اجتنبوا الطاغوت فمنهم من هدي الله و
منهم من حقت عليه الظلاله....» (نحل آيه 36)
আর আমরা প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি যেন তাদেরকে বলে আল্লহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে বিরত থাক। অতঃপর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যককে আল্লাহ্ হেদায়েত করেছেন আর (শত্রুতা ও আক্রোশের কারণে) কিছু সংখ্যকের জন্যে বিপথগামিতা অবধারিত হয়ে গেল। সুরা আন্ নাহল, আয়াত: ৩৬।
২। « والي مدين اخاهم شعيبا فقال يا قوم اعبدوالله و ارجو اليوم الآخر»(عنكبوت / 36)
আর আমি মাদইয়ানবাসীদের প্রতি তাদের ভাই শোআইবকে প্রেরণ করেছি। অতঃপর তিনি বললেন: হে আমার স্বজাতি! তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর, আর শেষ দিবসের প্রতি আশাবাদী থেকো। সুরা আল আনকাবুত, আয়াত: ৩৬।
আর সুরা হুদের ৫০ নং আয়াত ও এই মর্মেই এসেছে।
আই আয়াতসমূহ প্রমাণ করে যে, নবী করিমের (সা.) বে’সতের একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে সূচনা ও প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে মানব জাতিকে অবহতি করানো। তা সত্বেও বিভিন্ন কৃষ্টি ও সভ্যতার সাথে জ্ঞানের উন্নতি হলেও এখনও মানুষ মূর্তি পূজা থেকে হাত গুটিয়ে নেয়নি আর এক শ’ কোটি খ্রীষ্টান হযরত ঈসা নবীকে (আ.) খোদা মনে করে।
এই অবস্থায় এলাহী শিক্ষকরা যদি সমাজের মাঝে প্রেরিত না হতেন প্রত্যাবর্তন বা মা’আদ সম্পর্কে মানুষের অবস্থা কি হত?
নবী করিম (সা.) ও আয়েম্মায়ে মাসুমিনদের (আ.) হাদীসেও বে’সতের এরূপ উদ্দেশ্যর প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যার কয়েকটির ব্যাখ্যা আমরা এখানে উল্লেখ করবো।
নবী করিম (সা.) এক হাদীসে বর্ণনা করেন:
« ولا بعث الله نبياً ولا رسولاً حتي يستكمل العقل و يكون عقله افضل من جميع عقول امته»
আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিচারবুদ্ধি ও আক্বলকে পরিপূর্ণতা না করে কোন নবী বা রাসুলকে প্রেরণ করেননি আর তাঁদের বিবেক বুদ্ধি তাঁদের উম্মতের তুলনায় অনেক উর্ধে।
সন্দেহর অবকাশ থাকে না যে, সমাজে একত্ববাদের স্থায়িত্ব বিধান চিন্তা, জ্ঞান ও বুদ্ধির উন্নতির সাথে সাথে হয়। মানুষ যদি নিজের মূলকে জানতে না পারে, মাটি ও পাথরের সামনে মাথা নত করবে। কিন্তু জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা যারা সত্তার উৎসকে উপলদ্ধি করতে পেরেছেন, এই জগতের সৃষ্টিকর্তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
হযরত আলী (আ.) নবীর (সা.) বে’সতের সময়ের কথা বর্ণনা করেন যে, কিভাবে সে যুগের মানুষ খোদার পরিচয় লাভে অজ্ঞতার থাবাতে বন্দী ছিল, আর খোদার পরিবর্তে কার কার উপাসনা করতো, অথবা খোদাকে কোন কোন প্রণীর রূপ দিতো। অতঃপর নবী করিমকে (সা.) তাঁর সমাজের আক্বিদা বিশ্বাসের সংশোধনের জন্য প্রেরণ করা হয়। যেমন বর্ণনা করা হয়েছে:
“ মোহম্মদ (সা.) এর প্রভু তাঁর বার্তা বাহককে প্রেরণ করেছেন যাতে নিজের কৃত অঙ্গীকার পালন করতে পারেন, আর তাঁর মাধ্যমে নবুওয়্যাতের দায়িত্বকে শেষ করেছেন ”। আর ভূমিতে সেই যুগে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকম মাযহাব, ধরণ ও অনেক বেদাত ছিল। নবী করিম (সা.) তাদেরকে অজ্ঞতা থেকে একত্ববাদের পথে হেদায়েত করেন।
মতবিরোধ দূর করা:
নবীদের বে’সতের আরেক উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানব জাতির মধ্যে মতবিরোধ ও বিভক্তের দূরীকরণ। খোদার নবীদেরকে দ্বীন ও বিভিন্ন শিক্ষা সহকারে প্রেরণ করা হয়েছে যাতে মত পার্থক্য ও বিভেদকে দূর করতে পারেন। অবশ্য এই সকল আইন ও শিক্ষা তাদের জন্য যারা গ্রহণ করে ও বিশ্বাস রাখে। আর যারা মেনে নেয় না কার্যত তারা বিরোধ ও গন্ডগোল বাড়াবে।
নিম্নের আয়াতটি এই উদ্দেশ্যর উপর ইঙ্গিত করে বর্ণনা করে:
«كان الناس امه واحده فبعث الله النبيين مبشرين و انزل معهم الكتاب باالحق ليحكم بين الناس فيها اختلفوا فيه و مااختلف فيه الا الذين اوتوه من بعد ما جائتهم البينات بعياً بينهم فهدي الله الذين آمنوا لما اختلفوا فيه من الحق باذنه والله يهدي من يشاء الي صراط مستقيم.» (البقره / 213)
সমস্ত সকল মানুষ একই জাতি সত্বার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকরী হিসাবে নবীদেরকে প্রেরণ করলেন। আর তাদের সঙ্গে সত্যতার সাথে কিতাব অবতীর্ণ করলেন, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন। আর তাদের মধ্য থেকে একদল যাদেরকে তা দেয়া হয়েছিল পরিস্কার নির্দেশ এসে যাবার পর নিজেদের পারস্পরিক বিদ্রোহের কারণে এতে মতবিরোধ করেছে তারা ছাড়া আর কেউ করেনি। অতঃপর যারা ঈমান এনেছে যে বিষয়ে তারা মতবারোধ করেছিল আল্লাহ্ নিজের ইচ্ছায় তাদেরকে হেদায়েত করেছেন। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা, সরল পথে হেদায়েত করেন। সুরা আল বাকারা, আয়াত: ২১৩।
শত্রুতাসমূহ:
নবীদের মধ্যে একদল ছিলেন যারা তবলিগ ও খোদার বিধান প্রচারের সাথে এলাহী হুকুমত করতে সফল হয়েছিলেন। আর যে কোন হুকুমতই হোক না কেন তার তিনটি জিনিষের প্রয়োজন:
১। আইন বা কানুন।
২। আইন প্রণেতা।
৩। বিচারক বা ভাল মন্দ সম্পর্কে রায় দানকারী কিছু লোক।
অন্য কথায় এই তিনটাকে হুকুমত বলা হয়।
পবিত্র কোরানে কিছু নবীদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে যারা তবলিগ ও খোদার বিধান প্রচার ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে জনগণের মতভেদকে দূর করেছেন। অবশ্য এই মতভেদ খোদার হুকুম আহকামে ছিল না। বরং খোদার বিধানকে তারা মানতো কিন্তু যে বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিবাদ বা মতবিরোধ হতো সে সম্পর্কে খোদার বিধান তাদের জানা ছিলনা। তাই নবীদের কাছে তাদের বিবাদ ও মতভেদের বিষয়ে খোদার হুকুম জেনে নিতো। আসলে এটাও নবীদের বে’সতের একটি উদ্দেশ্য। বলা যেতে পারে “ মতবিরোধ দূর করা ” ছিল আসল উদ্দেশ্য। পবিত্র কোরানে অনেক আয়াত এ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন হযরত দাউদ নবী (আ.) এর জন্য বলা হচ্ছে:
“ হে দাউদ! তোমাকে এ পৃথীবিতে নিজের খলিফা হিসেবে প্ররণ করেছি, সুতরাং জনগণের মাঝে সত্যের সাথে রায় প্রদান কর আর কামনা, বাসনার অনুসরণ করনা যে, আল্লাহর পথ থেকে তোমাকে বিভ্রান্ত করে। ” সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৬/৩৮।
স্বাভাবিকভাবেই যে ব্যক্তি সমাজের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করে অবশ্যই তাকে বিচারকও হতে হবে। আর এ কাজকে হয় সে সরাসরি নিজেই আন্জাম দেবে অথবা পুন্যবান ও নেককার উপযুক্ত ব্যক্তিকে এ কাজে নিয়োগ করবে।
নবী করিমের (সা.) জন্যও বর্ণনা করা হয়েছে:
“ যদি তাদের মাঝখানে বিচার কর ন্যায়ের সাথে বিচার করো, খোদা ন্যায় বিচারককে ভালবাসেন ”। সুরা মাইদা, আয়াত: ৪৮।
এই সকল আয়াত দ্বারা আমরা বুঝতে পারি যে, নবীদের বে’সতের একটি কারণ হচ্ছে শত্রুতা ও বিরোধিতায় বিচার করা অর্থাৎ বিভিন্ন বিষয়ে মত পার্থক্যকে দূর করা।
সমাজে ন্যায়ের বাস্তবায়ন:
কিছু কিছু আয়াতে নবীদের বে’সতের ও কিতাবের অবতরণের উদ্দেশ্য জনগণের মধ্যে ন্যায়ের বাস্তবায়ন বলা হয়েছে। যেমন সুরা হাদীদের ২৫ নং আয়াতে এসেছে:
“ আমরা নবীদেরকে প্রকাশ্য প্রমাণ সহকারে প্রেরণ করেছি, আর তাদের সাথে কিতাব ও মিযান পাঠিয়েছি যাতে জনগণের মধ্যে ন্যায় বাস্তবায়িত হয়” ।
সর্বশেষ আপডেট (বুধবার, 14 জুলাই 2010 05:15)


